না ফেরার ব্যাকরণ (হার্ডকভার)
0 Ratings
0 Answered Questions
By (Authors) : রফিকুজ্জামান রণি
Save 62 BDT
Summary:
কালপরিক্রমণে জৈবরাজনীতি এবং ভূ-সংস্কৃতির প্রভাবে কবিতাকে আমরা বিচিত্রভাবে চিনি, নানানরূপে, আঙ্গিকে ও ভাষায় ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করি। এই যেমন: সনেট, সেস্টিনা, কোয়াট্রেন, ম্যাঙ্মি, রুবাই, হাইকু, ছন্দোবদ্ধ কবিতা, অনুকাব্য, মহাকাব্য, গদ্যকাব্য, গীতিকাব্য, শতপদীকাব্য, শের, শায়রী এবং দীর্ঘকবিতা ইত্যাদি।
এছাড়া অতিবাস্তবতা, রূঢ়বাস্তবতা, পরাবাস্তবতা ও যাদুবাস্তবতার লড়াই তো লেগেই আছে। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় এবং আধুনিকতা ও উত্তরাধুনিকতার গ্রহণ ও বর্জনের প্রতিযোগিতায় কেউ কারো থেকে কোনো অংশে পিছিয়ে নেই। এ সবের মধ্যেই আমরা চর্চা চালিয়ে যাই; কেউ সফল হই, কেউবা আবার মাঝপথে হারিয়ে যাই।
কবিতার অহেতুক তর্ক নিয়ে আমার আগ্রহ বরাবরই নাই বললেই চলে, দশকের এলার্জিও আমাকে স্পর্শ করতে পারেনি কখনও। মূলত আমি লিখে ও পড়ে আনন্দ পাই। তাই লেখালেখি ও পঠন-পাঠনের আনন্দটুকু সঙ্গে নিয়েই বেঁচে থাকতে চাই। এর ফলে কে আমাকে নর্দমায় ছুড়ে ফেললো, কে আবার মাথায় তুলে স্তুতি পাঠ করলো সে সব নিয়ে ভাবনাচিন্তার ফুরসতই খুঁজে পাই না।
হতে পারে নিজের প্রয়োজনে অথবা পাণ্ডিত্য প্রমাণে কিংবা স্বতন্ত্র পথ বিনির্মাণের তাগিদ থেকে কবিতাকে নানা রকম রূপ দানের চেষ্টা করে কবি। কিন্তু দিনশেষে কবিতাকে কোনো পাঠকই নির্দিষ্ট একটি ফর্মেট দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করে না, কোনো নাম-ছক দিয়েও শনাক্ত করে না। কেবলমাত্র শিল্প-সৌকর্য, স্বতন্ত্রকলা, বিন্যাস-প্রকরণ, দর্শনতত্ত্ব ও উদ্ভাবনী শক্তিমত্তা দিয়েই কবিতাকে বিচার করা হয়-এর বাইরে অন্য কিছু নয়। এখানে পূর্বপুরুষদের প্রভাব-প্রতিপত্তি কিংবা আভিজাত্য ফলানোর সুযোগ নেই, বয়স অথবা কোটার সুবিধাও নেই। মুখ্যত, রন্ধন ক্রিয়ার মেরিনেশনের মতো যে যতটা বৈচিত্র্য আনতে পারে, তার কবিতা ততটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
অনেকেই মনে করেন, কবিতা ব্যাকরণ মানে না। কথাটা সম্পূর্ণ সত্য নয়, আবার একেবারেই মিথ্যেও নয়। তবে তর্কের খাতিরে অনেক কথা বলা গেলেও, ইনফ্রানস্ট্রাকচার সুগঠিত না হলে, শব্দ ও বাক্যের জুতসই ব্যবহার না থাকলে কবিতার স্বাদ পানসে হবে এটাই স্বাভাবিক। এমন চর্চা কখনও কখনও পণ্ডশ্রমেও পরিণত হতে পারে। কেননা, অমার্জিত পরিকাঠামো কখনও বিশুদ্ধ শিল্পের সৌরভ ছড়াতে পারে না।
ইমার্সিভ আর্ট ইনস্টলেশনের প্রদর্শনীর মতো ক্ষুদ্রতম ঘূর্ণাবর্তের মধ্যে অনন্তকালের ছাপচিত্র এঁকে রাখে কবিতা। প্রেম-বিহর, দ্রোহ-খেদ, আ¶েপ-আখ্যান, ক্রোধ-উচ্ছ্বাস, সারল্য ও ক্ষিপ্রতা যেই উপাদানই থাকুন না কেন, কবিতা আদতে নির্মলতার প্রতীক; মানবিক স্থূলতারোধী, নির্ভরতা ও পরিশুদ্ধতার বাথান। গাঁথুনিশৈলি, দৃশ্যকলা, রূপ-রস ও বয়নকৌশল ভিন্ন ভিন্ন হলেও নির্মাণসূত্রের মেটাল ফেব্রিকেশন প্রায় অভিন্ন। কবিতা এতটাই দুর্বল ও সহজলভ্য শিল্প নয় যা গোগ্রাসে গিলে ফেলা যায়; আবার এতটাই কঠোর-দুর্বোধ্য উপাদানেও ঠাসা নয় যে সেটা হজম করতে গেলে কিনোয়ার দানা পেটে পুরতে হয়। তবলের খিরনের মতো মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান করেও চারপাশে ঝংকার তোলার শক্তি যোগায় যে, আমরা তো কেবল তাকেই কবিতা বলতে পারি।
একজন কবির কখনও অ্যাক্রোফোবিয়া তথা উচ্চতা ভীতি থাকে না, সীমানা প্রাচীর থাকে না। তাকে স্বপ্ন দেখাতে হয়, নিজেও স্বপ্ন দেখতে হয়। মেডিটেশন, নির্জনতা, ভ্রমণ-তৃষ্ণা, সাহস ও উদ্যমতা তাকে নতুন পথের সন্ধান এনে দেয়।
যার কলমের ডগায় পৃথিবীকে গলিয়ে দেওয়ার মতো শক্তিশালী এনজাইম লুকিয়ে থাকে, আমরা তো কেবল তাকেই কবি বলে ডাকি। জগতে একমাত্র কবিই পারে চোখ বন্ধ করে আন্দিজ পর্বতমালা ডিঙিয়ে ভূ-পৃষ্ঠের শেষ মৃত্তিকার ওপর দাঁড়িয়ে আলবাট্রস পাখির সঙ্গে নৃত্য-উল্লাসে মেতে উঠতে। তার অর্ন্তদৃষ্টির আলোকছটা উপরে-নিচে, ডানে-বাঁয়ে এবং সামনে-পেছনে সমান তালে প্রতিফলিত হয়। যদিও অলৌকিক কিছু শব্দ, গন্ধ ও ছায়া তাকে সব সময় ঘিরে রাখে, তারপরও হ্যালুসিনেশনের কালোরেখা তার কাব্যসত্তাকে বিনষ্ট করতে পারে না। ফলে ঘুমহীন চোখে সে ঘুম নামায় এবং ঘোরতর নিন্দ্রার ভেতরেও জেগে থাকার শক্তি পায় সে। কারণ, বর্ষণমন্দ্রিত রাত কবিকে ভাবনা দেয়, শরতস্নিগ্ধ মেঘের শুভ্রতা স্বপ্ন জাগায়, শিশিরঘন হেমন্তের আলোছায়া প্রেরণা যোগায়, গ্রীষ্মমথিত রোদ্দুরের তীব্র ঝাঁঝ প্রাণসঞ্চার করে, কুয়াশা-মোড়ানো শীতল পিরামিড দৃঢ়তা বাড়ায় এবং বসন্তমাতাল ফুল ও পাখিরা দেয় শব্দ ও ভাষা।
